ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

Live

স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি শ্লথ হয়ে পড়ছে

১২:১২, ৮ জুলাই ২০১৯ সোমবার

ডিপথেরিয়া ও পোলিওর মতো রোগ নির্মূলে সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। সাফল্য এসেছে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও। ধারাবাহিক উন্নতি ছিল মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য খাতের এ উন্নতি শ্লথ হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) সূচক বলছে, ১৯৯০-২০০০ সময়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি প্রতি বছর গড়ে যে হারে বাড়ছিল, পরের দশকে তা অনেকটাই কমে গেছে।

১৯৯০-২০১৬ সময়ে বিশ্বের ১৯৫টি দেশের স্বাস্থ্যসেবাসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ খাতের মান নির্দেশক সূচক এইচএকিউ প্রণয়ন করেছে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধীন স্বাধীন স্বাস্থ্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইএইচএমই। বয়সভিত্তিক নির্দিষ্ট রোগে মৃত্যুর অনুপাত এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। সূচকের মান ধরা হয়েছে শূন্য থেকে ১০০। সর্বোচ্চ মান নির্দেশ করছে ভালো অবস্থান। আর মানদণ্ডে স্কোর কম হলে তা স্বাস্থ্য খাতে সংশ্লিষ্ট দেশের দুর্বল অবস্থান নির্দেশ করে। ৩২টি রোগের তথ্য এক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এইচএকিউ সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০-২০০০ সময়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে প্রতি বছর গড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হারে উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। যদিও ২০০০-২০১৬ সময়ে উন্নতির এ হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ লক্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধি ও টিকাদান কর্মসূচির মতো ব্যবস্থা দিয়েই সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। অসংক্রামক রোগ সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এইচএকিউ সূচকে।

দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিভিন্ন সময় গবেষণা পরিচালনা করেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিপিআরসি)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, রোগের ধরন পাল্টেছে। আগে সংক্রামক রোগই ছিল মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এখন অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়েছে। ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক বেশির ভাগ রোগই প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে সেজন্য যেমন সচেতনতার প্রয়োজন, তেমনি এগুলোর উৎস চিহ্নিত করতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন—এগুলোও ক্যান্সারসহ অসংক্রামক অনেক রোগের কারণ। স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সামগ্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন।

গবেষণার তথ্য বলছে, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ (ইউআরআই) ও ডিপথেরিয়ার চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি সফলতা বাংলাদেশের। এ দুটি রোগে স্কোর ১০০। যদিও এ দুটি রোগের চিকিৎসায় সফলতা পেয়েছে বিশ্বের প্রায় সব দেশই। এর বাইরে দেশে হাম ও ধনুষ্টংকারের মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি। এ দুটি রোগের ক্ষেত্রে এইচএকিউ স্কোর যথাক্রমে ৮৯ ও ৭৭। সংক্রামক বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সফলতা এলেও অসংক্রামক রোগগুলোর ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানের তুলনায় এখনো পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। লিউকেমিয়ার চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিতে এইচএকিউ স্কোর ২২, ব্রেস্ট ক্যান্সারের ৪০, সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের ৫০, কোলন ক্যান্সারের ৩৯, টেস্টিকুলার ক্যান্সারের ১৮ ও স্ট্রোকের ক্ষেত্রে স্কোর ৩১।

এছাড়া ডায়রিয়ার চিকিৎসায় স্কোর ৪৮, হুপিং কাশির ৫২, অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ৪৩, বাতজ্বরের ৪১, ডায়াবেটিসের ৫৬ ও গলব্লাডারের চিকিৎসায় স্কোর ৬৩। 

গবেষণার তথ্য ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর দেশে রোগাক্রান্তদের মধ্যে ৬০ শতাংশ মারা যাচ্ছে ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের অসংক্রামক রোগে। দেশের মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ এ ঝুঁকির বাইরে রয়েছে। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ কখনই কোলেস্টেরল টেস্ট করায় না। এতে স্ট্রোক, হার্ট ব্লক, ডায়াবেটিস ও কিডনি বিকল কখন হয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতেও পারছে না। ৭০ শতাংশ লোক আছে, তারা কখনই রক্তই পরীক্ষা করায়নি। দিনে যে পরিমাণ ফলমূল, শাকসবজি খাওয়ার কথা, দেশের মানুষ তার মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ গ্রহণ করে।

অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে অসন্তুষ্টি ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বিদেশে যাচ্ছেন অনেকেই। ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বোচ্চ। ওষুধের দাম অনেক বেড়েছে, রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা খাতে ব্যয় বেড়েছে, অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়েছে ও ভুল চিকিৎসা বেড়েছে। প্রেসক্রিপশনের অডিট, হাসপাতালে মৃত্যুর অডিট—এমন কয়েকটি বিষয়ে অনেক বছর ধরে বলা হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। এছাড়া চিকিৎসাসেবার অনেকটাই এখনো কেন্দ্রীভূত। প্রায় সবকিছুই রাজধানীকেন্দ্রিক। প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসকদের অবস্থানের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি। এগুলো কার্যকর না হলে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুরাশা হবে।

সর্বশেষ এইচএকিউ সূচক অনুযায়ী, ১৯৫টি দেশের মধ্যে ৪৮ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম। ১৯৯০ সালে এইচএকিউ সূচকে বাংলাদেশের গড় স্কোর ছিল ১৭ দশমিক ৮। ২০০০ সালে গড় স্কোর দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৫ আর ২০১৬ সালে বাংলাদেশের গড় স্কোর দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ৬। মোট স্কোর বাড়লেও ২০০০-২০১৬ সাল পর্যন্ত বছরভিত্তিক গড় বৃদ্ধির হার কমেছে।

যদিও এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণ বলে, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি ব্যাপক হারে বেড়েছে। ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ পরিমাপে আন্তর্জাতিকভাবে  যেসব সূচক ব্যবহার করা হয়, তার সবগুলোতেই আমরা এগিয়েছি। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে আমরা দ্রুত হারে এগিয়েছি গত দশকে।

মানের বিষয়ে হয়তো সব ক্ষেত্রে সমানভাবে এগোতে পারিনি। তার পরও কোয়ালিটেটিভলি, বিশেষ করে ক্লিনিক্যাল ট্রিটমেন্টে অনেক বেশি এগিয়েছি। যে প্রশ্নটি আমাদের ক্ষেত্রে সবাই করে, সেটা হলো সবার জন্য স্বাস্থ্য। হয়তো আমাদের প্রসবজনিত মাতৃমৃত্যু হার কমেছে, কিন্তু এগুলো বেশি কমেছে যাদের আয় বেশি তাদের। গরিব মানুষের ক্ষেত্রেও কমেছে, কিন্তু কম হারে। এটা নিয়েই আমরা বেশি আলোচিত বা সমালোচিত হই।

কৃষি কাগজ/এস এম