ঢাকা, রোববার ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

Live

রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণের পণ্য বিক্রি হচ্ছে খাতুনগঞ্জে

১৫:০৯, ৭ অক্টোবর ২০১৯ সোমবার

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় বিতরণকৃত ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে খাদ্যপণ্যের পরিমাণ অনেক বেশি। রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতরণের পর উদ্বৃত্ত এ পণ্য চলে আসে স্থানীয় বাজারে। সেখান থেকে সিন্ডিকেটের হাত ঘুরে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতরণকৃত পণ্য চলে যায় ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে।

খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের আড়ত ও পাইকারি দোকানগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আসা ট্রাকভর্তি পণ্য প্রতিদিনই প্রবেশ করছে খাতুনগঞ্জে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, টয়লেট্রিজ, প্রসাধনী, ক্রোকারিজ ও স্টেশনারিসহ গৃহস্থালি সামগ্রী। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবেশ করছে ডালজাতীয় পণ্য সাদা মটর ও মসুর ডাল। খাতুনগঞ্জের বাজারে প্রতিদিন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুধু ডালই আসছে ১৫-২০ ট্রাক। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে আসা এসব পণ্য খাতুনগঞ্জের বাজারে বিক্রিও হয় স্বাভাবিকের তুলনায় কম দামে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত উখিয়ার রমিজ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, দাতা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ক্রোকারিজ, স্টেশনারি, ওষুধ, টয়লেট্রিজ, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বিতরণকৃত পণ্যের অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করে রোহিঙ্গারা। এমনকি এসব ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে টয়লেট্রিজ পণ্যসহ এমন অনেক পণ্য রয়েছে, যেগুলো ব্যবহারে অভ্যস্ত নয় রোহিঙ্গারা। এনজিওর মাধ্যমে এসব পণ্য বিতরণের পর পরই ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হয়ে যায়। এরপর স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্যগুলো পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলার বাজারগুলোয় চলে যায়। এর মধ্যে ডাল, চাল, তেল, লবণ, চিনিসহ যেসব পণ্য বেশি পরিমাণে উদ্বৃত্ত থেকে যায়; সেগুলো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে চলে আসে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আসা পণ্য ক্রয়ের সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি জানান, খাতুনগঞ্জ থেকে ডালজাতীয় পণ্য কিনে নিয়ে সেগুলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিতরণ করে থাকে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিতরণকৃত এসব পণ্যের বেশির ভাগই আবার বাইরে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হয়ে যায়। একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব পণ্যের একাংশ টেকনাফ থেকে কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার স্থানীয় বাজারে চলে যায়। এর মধ্যে যেসব পণ্য বেশি পরিমাণে ফেরত আসে, সেগুলো চলে যায় খাতুনগঞ্জে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, খাতুনগঞ্জের মেসার্স হালেক ট্রেডিং, হাজী স্টোর, সবুজ স্টোরসহ আরো ১৫-২০ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পফেরত পণ্য বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত।

বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছেন খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এখানকার ডাল ব্যবসায়ী মেসার্স হক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আজিজুল হকসহ আরো কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ফেরত আসা পণ্যের কারণে বাজারের দ্রব্যমূল্যের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কারণ এসব পণ্য বাজারে বিক্রি হচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম দামে। এসব পণ্য কেনাবেচার সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট জড়িত, যার বিস্তৃতি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে খাতুনগঞ্জ পর্যন্ত। বাজারের নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী এসব রোহিঙ্গা ক্যাম্পফেরত পণ্য ক্রয় করেন। এরপর এসব পণ্য স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করেন তারা। ফলে বাজারের অন্যান্য পাইকারি ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রিতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে কেনা দামের চেয়েও কম দামে লোকসান দিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।

জানা গেছে, বর্তমানে খাতুনগঞ্জে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি রাশিয়া ও কানাডা থেকে আমদানীকৃত সাদা মটর বিক্রি হচ্ছে ২৪-২৫ টাকা দামে। কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ফেরত আসা একই মানের সাদা মটর বিক্রি হচ্ছে ২০-২১ টাকা কেজিতে।

এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা থেকে আমদানীকৃত মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪২-৪৪ টাকা দামে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আনা একই মানের মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩০-৩২ টাকায়। অর্থাৎ খাতুনগঞ্জে রোহিঙ্গা ক্যাম্পফেরত মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে স্বাভাবিকের তুলনায় কেজিতে ৮-১০ টাকা কম দামে।

চট্টগ্রাম ডাল মিল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সঞ্জয় দেব খোকন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ফেরত আসা এসব পণ্য বেচাকেনা করে বাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভালো মুনাফা করছেন। কিন্তু স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি হওয়া এসব পণ্যের কারণে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। হঠাৎ করেই পণ্যের দাম ওঠানামা করছে। এতে আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা অনেক সময় কেনা দামের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক নিপীড়নমূলক অভিযান শুরু হওয়ার পর সে দেশ থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু। সরকারি-বেসরকারি সাহায্যকারী সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সংঘাত শুরুর পর এখন পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে পৌনে আট লাখ উদ্বাস্তু। এছাড়া আগে থেকেই অবস্থান করছিল আরো অনেক রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্বাস্তু শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৯ লাখ ১১ হাজার ৫৫৬ জন।

কৃষি কাগজ/এস এম