ঢাকা, শুক্রবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

Live

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পর্যটন

অনীক ইসলাম

১৯:৪৮, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার

বণিক বার্তার সম্পাদকীয় পাতায় দারুণ সব লেখার সুবাদে মো. আব্দুল হামিদ স্যারের সঙ্গে পরিচয়। গত বছর বইমেলায় তার প্রকাশিত ‘শিক্ষা স্বপ্ন ক্যারিয়ার’ বইটি এক ধরনের মুগ্ধতা সৃষ্টি করেছিল। তাই এবার তার কোনো বই আসছে কিনা, তা জানতে উন্মুখ ছিলাম। দিব্য প্রকাশের ফেসবুক পেজ থেকে জানলাম, ‘বিশ্ব-প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পর্যটন’ শিরোনামে তার একটি বই মেলায় এসেছে। ভেবেছিলাম, ট্যুরিজমবিষয়ক বই পড়তে তেমন একটা ভালো লাগবে না। কিন্তু তার লেখার ধরন পাঠককে যেন অনায়াসে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। হাতে পাওয়ার পর প্রায় একটানে বইটি পড়ে শেষ করলাম।

বাংলাদেশের পর্যটন সম্পর্কে গত্বাঁধা যে বক্তব্য চালু আছে, লেখক শুরুতেই তাকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন। অর্থাৎ সবাই বলে, এটা খুবই সম্ভাবনাময় শিল্প, এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব, অধিকসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে ইত্যাদি। তার এমন বক্তব্যে একটু বিস্মিতও হয়েছিলাম। এই মানুষটি বলতে চাইছেন, এ খাতের বাংলাদেশে মোটেও সম্ভাবনা নেই! বিস্তারিত পড়ার পর বুঝলাম, তিনি হয়তো অভিমান থেকে এমনটা বলেছেন। তিনি আসলে মন থেকেই চান প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোয় নজর দেয়া হোক, নেয়া হোক কার্যকর উদ্যোগ। কিন্তু সেগুলো না হওয়ায় তিনি বিরক্ত হয়ে তেমনটা বলেছেন।

মূল টেক্সটে প্রথম ভাগে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সময় একজন পর্যটন শিক্ষার্থী হিসেবে যে বিষয়গুলো খেয়াল করেছেন বা তার নজর কেড়েছে, সেগুলোকে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন। ভ্রমণকাহিনীর আদলে গুরুত্বপূর্ণ সব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন, যা খুবই সুখপাঠ্য ছিল। কোপেনহেগেন, ভেনিস, মিলান, ভিয়েনা, বার্সেলোনা, লুবিয়ানা, জাগরেব, ইস্তাম্বুলসহ বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি ওভারঅল ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, স্লোভেনিয়া, আলবেনিয়া ও মন্টিনিগ্রো ভ্রমণের সময় হওয়া অভিজ্ঞতা তিনি বাংলাদেশের এ খাতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন সুনিপুণভাবে। ফলে পড়া শুরু করার পর হতাশ তো হইনি, বরং অনেক বিষয়ে জানতে পেরেছি।

দ্বিতীয় ভাগে লেখক বাংলাদেশের পর্যটন বিষয়ে বহুবছরের পর্যবেক্ষণ বেশ সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ঠিক কোথায়, দুর্বলতা ও সক্ষমতার জায়গাগুলো, পর্যটন উন্নয়নে প্রয়োগযোগ্য মডেল ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে সুখপাঠ্যভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। কর্মক্ষেত্র সিলেট হওয়ার কারণে তিনি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের পর্যটনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পরম মমতায় সেগুলো তুলেও ধরেছেন সম্ভাব্য ট্যুরিস্ট ও নীতিনির্ধারকদের জন্য। রাতারগুল জলাবন নিয়ে লেখা অধ্যায়টি আমাকে খুবই স্পর্শ করেছে। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত অধিকারে থাকা দেশের নাগরিক হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন সৈকত ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও তিনি শেয়ার করেছেন গল্পচ্ছলে। খুব সম্ভবত তিনি উত্তরবঙ্গের মানুষ হওয়ায় পর্যটনক্ষেত্রে একেবারে অবহেলিত উত্তরাঞ্চলের মাঝেও খুঁজে পেয়েছেন পর্যটন বিকাশের বিপুল সম্ভাবনা।

তৃতীয় ভাগে রয়েছে মোট পাঁচটি অধ্যায়। সেগুলো বিশেষভাবে পর্যটনবিষয়ক শিক্ষার্থী ও প্র্যাকটিশনারদের কাজে লাগবে বলে আমার মনে হয়েছে। সেখানে পর্যটন শিল্পের ক্রমবিকাশ, সাম্প্রতিক প্রবণতা, আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ, এ খাতের টেকসই উন্নয়নে করণীয় ইত্যাদি বিষয় দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সবশেষে তিনি এক চমক রেখেছেন বাংলাদেশের পর্যটনবিষয়ক গবেষকদের জন্য। তার সংগ্রহে থাকা কয়েকশ আর্টিকেল, বই, থিসিস ও রিপোর্টের এক সংযুক্তি দিয়েছেন।

পুরো বইটিতে তিনি শতাধিক রেফারেন্স যুক্ত করলেও তা পাঠের গতিতে ছন্দপতন ঘটায়নি বা বিরক্তির উদ্রেক করেনি। আমাদের দেশে পর্যটনসংক্রান্ত বই বলতেই ‘ট্যুর গাইড’ টাইপের একটা কিছু বোঝায়। কিন্তু এ বইটি সত্যিকার অর্থে একজন গবেষকের চোখে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। যারা এ খাতের সমৃদ্ধিতে কাজ করছেন, পড়াচ্ছেন বা পড়ছেন, গবেষণা করছেন, তাদের খুব ভালো লাগবে বইটি। নতুন বইটি সংশ্লিষ্ট পাঠকদের কাছে পৌঁছে যাক, সেই শুভকামনা রইল। বইটি পাওয়া যাচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় দিব্য প্রকাশের ৫১৩-৫১৬ নম্বর স্টলে। রকমারি ডটকমে অর্ডার দিয়েও বইটি সংগ্রহ করা যাবে।