ঢাকা, রোববার ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

Live

পেঁয়াজের ঝাঁজ কমবে কবে

০৯:৫০, ২ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার

দেশের পেঁয়াজের বাজারে শিগগিরই কোনো সুখবর মিলছে না। সরকারের তরফ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছেÑ দেশে যথেষ্ট পরিমাণ পেঁয়াজের মজুদ রয়েছে, সরবরাহও ভালো। কিন্তু ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পেঁয়াজের বাজার খুব শিগগির স্থিতিশীল হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের দাবি, আগে পেঁয়াজভর্তি গড়ে দেড়শ থেকে ২শ ট্রাক আসত ভারত থেকে। কিন্তু ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় মিয়ানমার এবং তুরস্ক থেকে যে পরিমাণ আমদানি করা হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। বাজারে দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে বিক্রেতাদের খেয়ালখুশিমতো ওঠানামা করছে পেঁয়াজের দাম।

গতকালও রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোয় এক কেজি দেশি পেঁয়াজের জন্য গুনতে হয়েছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। ১০০ টাকার নিচে মিলছে না আমদানি করা পেঁয়াজ। যদিও মিসর ও মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রামে এসেছে ১৩ কনটেইনার পেঁয়াজ। আমদানি করা ওই পেঁয়াজ পাইকারি বাজারে ঢুকেছে।

পেঁয়াজ আমদানিকারক হাজি মো. মাজেদ গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, দেশি পেঁয়াজ না আসা পর্যন্ত পেঁয়াজের বাজারে সুখবর মিলবে না। কেবল পেঁয়াজ লাগানো শুরু হচ্ছে। তবে বৃষ্টির কারণে কাজ বিলম্ব হচ্ছে। এ পেঁয়াজ ঘরে তুলতে আরও আড়াই থেকে তিন মাস সময় লেগে যাবে। তিনি আরও বলেন, আগে প্রতিদিন প্রায় ২শ ট্রাক পেঁয়াজ আসত ভারত থেকে, কিন্তু এখন বন্ধ। মিয়ানমার ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজভর্তি ২০ থেকে ৩০ ট্রাক আমদানি হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

আরেক আমদানিকারক রফিকুল ইসলাম গতকাল বলেন, ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত রপ্তানিমূল্য ২৫০ ডলার থেকে সাড়ে ৮শ ডলার করায় প্রথম দফায় দেশে পেঁয়াজের মূল্য বেড়ে যায়। এর পর গত রবিবার রপ্তানি বন্ধ ঘোষণায় আরেক দফা বাড়ে। আমাদের বিকল্প বাজার মিয়ানমার থেকে ৪শ ডলার থেকে সাড়ে ৪শ ডলারে আমদানি করলেও ভারত রপ্তানি বন্ধের পর মিয়ানমারও বাড়িয়ে দিয়েছে রপ্তানিমূল্য। ফলে এখন সাড়ে ৭শ ডলারে আমদানি করতে হচ্ছে মিয়ানমার থেকে। এ ছাড়া মিসর থেকে পেঁয়াজ আনা সময়সাপেক্ষ। তিনি আরও বলেন, গতকাল দুই দেশ মিলিয়ে ১৩ কনটেইনার পেঁয়াজ এসেছে। প্রয়োজনের তুলনায় এটি কম। অবশ্য আশার বাণী শুনিয়ে আসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম।

গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমদানির ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন এবং সুদের হার হ্রাস করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক পদক্ষেপ নিয়েছে। স্থল ও নৌবন্দরগুলোয় আমদানি করা পেঁয়াজ দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাসের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে পেঁয়াজ দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পৌঁছানোর জন্য সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের ১০ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ টিম গতকাল থেকে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, যশোর, দিনাজপুর, পাবনা, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার বাজারগুলোয় তদারকি শুরু করেছে। এলসির মাধ্যমে মিয়ানমার, মিসর ও তুরস্ক থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বন্দরে খালাস শুরু হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমার থেকে বর্ডার ট্রেডের মাধ্যমে টেকনাফ বন্দর দিয়ে আমদানি করা পেঁয়াজ এবং দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি হাটগুলোয় বিক্রীত পেঁয়াজ দ্রুত সারাদেশে নির্বিঘেœ পৌঁছে যাচ্ছে। পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় আছে।

অন্যদিকে দেশে পেঁয়াজের মূল্য ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ট্রাকসেলে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। গতকাল থেকে ট্রাক সেলের সংখ্যা ৩৫টিতে উন্নীত করা হয়। এতে স্বল্প আয়ের মানুষ ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।

সরকারি হিসাবমতে, দেশে বছরে মোট পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩.৩০ লাখ টন। এর ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ স্বাভাবিকভাবেই নষ্ট হয়। পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বছরে আমদানি হয়ে থাকে ৮ থেকে ১০ লাখ টন। হিসাব মোতাবেক দেশে পেঁয়াজের কোনো সংকট নেই।

এদিকে খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় বাজার হামিদউল্লাহ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস আমাদের সময়কে বলেন, বন্দরে পেঁয়াজ এসেছে। টেকনাফ দিয়েও পেঁয়াজ ঢুকছে। কয়েক দিন পেঁয়াজের ব্যবহার কম করলে দাম এমনিতেই কমে যাবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পেঁয়াজ বেশি দিন মজুদ রাখার মতো পণ্য নয়। আবহাওয়া ভালো থাকলে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ গুদামজাত করতে পারবে। এর বেশি হলে পচে যাবে। এরই মধ্যে অনেকেই পেঁয়াজ কেনা কমিয়ে দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে পেঁয়াজের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির কারণে গতকাল মঙ্গলবার খাতুনগঞ্জে অভিযান পরিচালনা করেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা প্রশাসনের কাছে পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক রাখার অঙ্গীকার করেন। পরে গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক রাখতে নির্দেশ দেন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভিন তিবরিজি। উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতারা আজ বুধবার বৈঠক করে দাম কমানোর সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে জানান।

জানা গেছে, সাতক্ষীরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মূলত খাতুনগঞ্জের আড়তদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভারতের রপ্তানি বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দাম বাড়ানোর বিষয়টি বলা হয়। আড়তদাররা বলছেন, সাতক্ষীরা-চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমদানিকারকদের চাপেই মূলত তারা পেঁয়াজ বাড়তি দামে বিক্রি করেছেন।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মিয়ানমার ও মিসর থেকে ৪২০ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছে ঢাকার তিনটি প্রতিষ্ঠান এনএস ইন্টারন্যাশনাল, জেনি এন্টারপ্রাইজ এবং হাফিজ করপোরেশন। পণ্য চালানগুলো খালাসের দায়িত্বে নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান মারকো ইন্টারন্যাশনালের মালিক একরামুল হক ভূঁইয়া আমাদের সময়কে বলেন, মিায়ানমার ও মিসর থেকে ১৪ কনটেইনারে করে ৪২০ টন পেঁয়াজ এসেছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও ১০ কনটেইনার আসবে।

খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি সোলায়মান বাদশা আমাদের সময়কে বলেন, গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত রপ্তানিমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করলে এ সমস্যা দেখা দিত না। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি হয়। এখন তারা রপ্তানি বন্ধ করাতে হঠাৎ সংকট দেখা দিয়েছে। তবে এখানে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দাম বাড়িয়েছে। তিনি জানান, সোনামসজিদ, ভোমরা ও হিলিবন্দর দিয়ে দৈনিক ৪০ লাখ ৫০ হাজার কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ দেশে ঢুকত। চাহিদা ছিল বলেই প্রতিদিন এ পরিমাণ আমদানি হতো। এ চাহিদা পূরণে অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি বাড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে কিছু দিন সময় লাগবে।