ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

Live

চামড়াশিল্প নগর: নদীদূষণ চলছেই, সঙ্গে দোষাদোষী

১২:০১, ১০ অক্টোবর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

পাইপলাইন উপচে নর্দমায় যায় ট্যানারির তরল বর্জ্য। তিনটি এলাকা দিয়ে তা নদীতে পড়ে। গতকাল সাভারের চামড়াশিল্প নগরে। সাভারে চামড়াশিল্প নগর পরিদর্শনে গিয়ে শিল্পমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, শিল্পসচিব ও বিসিক চেয়ারম্যান যেখানে বৈঠক করছিলেন, তার ঠিক উল্টো দিকের নর্দমা দিয়ে অবিরত ধারায় বর্জ্য গিয়ে পড়ছিল ধলেশ্বরী নদীতে। এক বা দুই দিন নয়, মাসের পর মাস ধরে এভাবেই নদীটি দূষণের শিকার হচ্ছে। এ জন্য বিসিক মানে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা দুষছে ট্যানারিমালিকদের, আর ট্যানারিমালিকেরা দুষছেন বিসিককে।

দূষণ বন্ধ হবে কবে—শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং শিল্পসচিব মো. আবদুল হালিমের উপস্থিতিতে এটিই ছিল সাংবাদিকদের প্রশ্ন। উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল বিসিকের চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণে পরামর্শকের দায়িত্বে থাকা বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশনের (বিআরটিসি) দলনেতা অধ্যাপক মো. দেলোয়ার হোসেনের ওপর। তিনি সেই পুরোনো কথাই বললেন, দোষ দিলেন ট্যানারিমালিকদের ওপর।

 

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্যানারিগুলো তরল বর্জ্যের সঙ্গে কঠিন বর্জ্য পাইপলাইনে ছেড়ে দেয় বলে তা আটকে যায়। এতে বর্জ্য উপচে পড়ে। পরিষ্কার করার কারণে এত দিন উপচে পড়েনি। তবে ঈদুল আজহার পর উপচে পড়ছে।

বৈঠকে চামড়াশিল্পসংশ্লিষ্ট তিনটি সমিতির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ট্যানারির ওপর দোষ চাপানোর বিষয়ে তাঁরা ভেতরে কোনো উত্তর দেননি। তবে বাইরে বেরিয়েই সাংবাদিকদের তাঁরা বলেন, বর্জ্য পাম্প করে সিইটিপিতে নেওয়ার কথা। সেটা ঠিকমতো কাজ করে না। নেতাদের একজন প্রথম আলোকে বলেন, সব কথা সব সময় কি বলা যায়?

আগে ঢাকার হাজারীবাগের ট্যানারির বর্জ্যে বুড়িগঙ্গা দূষিত হয়েছে। এখন সাভারে ১৯৯ একরের কিছু বেশি জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত চামড়াশিল্প নগরের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী নদী।

ট্যানারিগুলোকে সাভারে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, চামড়াশিল্পকে পরিকল্পিত শিল্পনগরে নেওয়া, নদীদূষণ রোধ এবং খাতটিকে পরিবেশবান্ধব করে রপ্তানি বাড়ানো। এ লক্ষ্যে ২০০৩ সালে প্রকল্প নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। চামড়াশিল্প নগর বাস্তবায়ন শুরু করে বিসিক। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়নি।

বিসিকের ব্যর্থতা ও মালিকদের গড়িমসিতে হাজারীবাগ ছাড়ার সময় শুধু পেছাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত মালিকেরা যেতে বাধ্য হন উচ্চ আদালতের নির্দেশে। ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগে ট্যানারির গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এরপর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারের চামড়াশিল্প নগরে যাওয়া শুরু করে। আড়াই বছর পরও সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর নয়।

নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন ও সালমান এফ রহমান গতকাল মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে চামড়াশিল্প নগরে পৌঁছান। তার আগেই চামড়াশিল্প নগর ঘুরে দেখা যায় চলমান প্রায় প্রতিটি ট্যানারির সামনে বর্জ্য উপচে পড়ার চিহ্ন। চামড়াশিল্প নগরের শ্রমিকেরা জানান, দুপুরের পর থেকে ট্যানারিতে বর্জ্য ছাড়ার পরিমাণ আরও বাড়ে। তখনই পুরোদমে উপচে পড়তে শুরু করে। একটি বড় ট্যানারির সামনে দেখা গেল, তারা উপচে পড়া ঠেকাতে ম্যানহোলের ঢাকনার চারপাশে ইটের গাঁথুনি দিয়েছে। পাশাপাশি একটি পাইপলাইন দিয়ে বর্জ্য নর্দমায় ফেলছে।

সিইটিপিতে যাওয়ার রাস্তায় দেখা গেল, উপচে পড়া বর্জ্য সদ্য পরিষ্কার করা। জানতে চাইলে শ্রমিকেরা জানান, মন্ত্রী আসবেন বলে পরিষ্কার করা হয়েছে।

অবশ্য চামড়াশিল্প নগরের রাস্তাঘাট সংস্কার করা হয়েছে। তবে শিল্পমন্ত্রী হিসেবে নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার পর কার্যক্রমে গতি এসেছে। দূষণবিষয়ক প্রশ্নের পর গতকাল সালমান এফ রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ট্যানারিতে পানির মিটার বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বেশি পানি ব্যবহার করা হয় বলে এখন বর্জ্য বেশি হয়। এ ছাড়া একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। তারা এটি পর্যবেক্ষণে রাখবে।

এদিকে দেশের চামড়াশিল্পে রপ্তানি আয় কমছে। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি আয় কমেছে ৬ শতাংশ। এরপর গত তিন মাসে কমেছে ৫ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক আবু ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, বুড়িগঙ্গা দূষিত হয় বলেই ট্যানারি সাভারে নেওয়া হয়েছে। সেখানে ৫৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্জ্য পরিশোধনব্যবস্থা করা হচ্ছে। নদী যাতে দূষণ না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি করা উচিত। তিনি বলেন, ‘আমরা গবেষণায়ও দেখেছি, নদীদূষণ নিয়ে স্থানীয়রা খুবই বিচলিত।’

কৃষি কাগজ/এস এম

সূত্রঃ প্রথম আলো