ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০২ এপ্রিল ২০২০ | ১৮ চৈত্র ১৪২৬

Live

কৃষিজ উৎপাদনশীলতা ও আয় দ্বিগুণ করা বড় চ্যালেঞ্জ

১১:৪০, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ মঙ্গলবার

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) আওতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধার অবসান, খাদ্যনিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। একই সঙ্গে টেকসই কৃষির প্রসারের অংশ হিসেবে কৃষিজ উৎপাদনশীলতা এবং ক্ষুদ্র পরিসর খাদ্য উৎপাদকদের আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে সাফল্য লাভের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমতার আওতায় এনে উন্নয়নের স্রোতধারায় যুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে এসডিজি বাস্তবায়নের পথে কাজ করছে।

মাঠ পর্যায়ে এসডিজি বাস্তবায়নের গুরুত্ব সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানেন। তবে কঠিন কঠিন শব্দের বেড়াজাল টপকে লক্ষ্যমাত্রার সঠিক অর্থ উপলব্ধি অনেকের কাছে কষ্টসাধ্য। লক্ষ্য পূরণে কী কী করতে হবে সেটি মোটা দাগে সবাই জানেন। তবে কোন নিক্তিতে সেটি মাপা হবে, তা অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়।

এসডিজি অগ্রগতি প্রতিবেদন-২০১৮ অনুযায়ী বিশ্বের ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম। ২০১৬ সাল থেকে এর কার্যকাল শুরু হলেও চার বছরে এসডিজি অর্জনে করণীয় তথা সূচকের বিপরীতে স্থানীয়ভাবে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়ে ওঠেনি। বিশেষজ্ঞরাও সহজ ভাষায় লক্ষ্য স্পষ্ট না করে কঠিন শব্দের জাল বুনে চলেছেন।

এসডিজির ১৭টির মধ্যে ১০টি লক্ষ্যমাত্রা এবং এর অন্তর্গত ৩৩টি টার্গেটের সঙ্গে কৃষি খাতের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কৃষিজ উৎপাদনশীলতা এবং ক্ষুদ্র-পরিসর খাদ্য উৎপাদকদের আয় দ্বিগুণ করা। উৎপাদনশীলতা শব্দটি কৃষি খাতের সঙ্গে জড়িতরা, এমনকি গবেষক, আমলা ও নীতিনির্ধারকদের কাছেও তুলনামূলক নতুন। অনেকেই মনে করেন, উৎপাদনশীলতা মানে হলো শস্যের ফলন কিংবা উৎপাদন বাড়ানো। তাদের মতে, দ্বিগুণ ফলনশীল নতুন জাত উদ্ভাবন করে দ্বিগুণ ফসল ফলাতে না পারলে এসডিজি অর্জিত হবে না। এতে মাঠ পর্যায়ে এসডিজি বাস্তবায়নের কৌশল বাস্তবায়নকারীরা দ্বিধায় পড়ে যান। ফলে প্রশ্ন ওঠেছে, এসডিজি কি আদৌ অর্জনযোগ্য নাকি দলিলসর্বস্ব।

সহজ করে বলতে গেলে, উৎপাদনশীলতা মোটেও ফলন বা উৎপাদন বাড়ানো সমার্থক নয়। এটি মূলত দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত, যা প্রতি একক ইনপুটের বিপরীতে আউটপুটের অনুপাত দিয়ে মাপা হয়ে থাকে। অর্থনীতির পরিভাষায় জমি, শ্রম, সেচের মতো বিভিন্ন একক কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার হচ্ছে, সেটির পরিমাপককে উৎপাদনশীলতা বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক মণ ধানকে যদি আউটপুট হিসেবে বিবেচনা করি, আর একক হিসেবে জমি, শ্রম বা সেচ ব্যবহারের নিরিখে দক্ষতা মেপে দেখতে যাই, তাহলে তিন ধরনের উৎপাদনশীলতা পাব। এগুলো হলো জমির উৎপাদনশীলতা, শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা ও সেচের পানির উৎপাদনশীলতা। সব নিয়ামক একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে টোটাল ফ্যাক্টর প্রডাক্টিভিটি মাপা হয়, যা জটিল একটি প্রক্রিয়া। তাই আংশিক পরিমাপকগুলো সুবিধাজনক, বাস্তবিক ও গ্রহণযোগ্য।

যাহোক, জমির উৎপাদনশীলতা তথা ফলন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের কৃষি খাতের সাফল্য বিশ্বের জন্য অনুকরণীয়। আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের ৯৪তম হলেও বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে বিশ্বে ১১তম এবং শস্যের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে। পিছিয়ে আছি কেবল কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির টেকসই মোকাবেলায়।

এসডিজির মূল কথাই হচ্ছে টেকসই ও অর্জনযোগ্য উন্নয়ন। এতে আয় ও উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণকরণের উপায় হিসেবে মূল্য সংযোজন ও অকৃষিজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। জোর দেয়া হয়েছে বাজার নিশ্চয়তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার ওপর। এসব বিবেচনায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দ্বিগুণ কৃষিজ উৎপাদনশীলতা মাপার বাটখারা হিসেবে শ্রম উৎপাদনশীলতা বা শ্রম এককে উৎপাদনের পরিমাণকে লক্ষ্য (সূচক ২.৩.১) নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) কর্তৃক ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ওয়েব-এক্স মিটিংয়ের পর্যালোচনায় এটিকে টায়ার-২-এর শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষিতে উৎপাদন খরচের লাগাম টেনে ধরা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আবহমান কাল থেকে উপমহাদেশের কৃষি শ্রমঘন, পরিবারকেন্দ্রিক ও প্রকৃতিনির্ভর। তৈরি পোশাক শিল্পে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়া, শিক্ষা বিস্তার ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় তরুণদের সামাজিক অবস্থান বদলে যাচ্ছে। এ কারণে ভোরবেলায় গ্রামের বাজার বা কোনো চৌরাস্তায় কাস্তে-কোদাল হাতে কাজের আশায় অনিশ্চিত দাঁড়িয়ে থাকা, এরপর রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ক্ষেতে সারা দিন পরিশ্রম করার চেয়ে বিকল্প পেশাগুলো আরামপ্রদ ও ঝুঁকিমুক্ত বিবেচিত হচ্ছে। তরুণদের কাছে কৃষিকাজ এখন আর আকর্ষণীয় নয়। সচ্ছল-অসচ্ছল নির্বিশেষে কৃষক বাবা সন্তানকে এ পেশায় আনতে চান না। পারিবারিক শ্রমিকের ব্যবহার কমে যাওয়ায় ও দিনমজুরের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় ফসল উৎপাদন খরচও বাড়ছে।

যান্ত্রিকীকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে ফসল কাটার মৌসুমে শ্রমিক চাহিদা বেড়ে যায়। বেশি মজুরির আশায় এক এলাকার দিনমজুরদের অন্য এলাকায় পাড়ি জমাতে দেখা যায়। এলাকাভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক সংকটের সুযোগে ভরা মৌসুমে দৈনিক মজুরি প্রায় দ্বিগুণ হয়। বাড়তি মজুরির বোঝা বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে তোলে।

কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করে প্রতি হেক্টর জমির ফসল কাটতে প্রয়োজনীয় শ্রমঘনত্ব নিমেষে কমিয়ে আনা সম্ভব। অর্থাৎ কাস্তের বদলে হারভেস্টার ব্যবহার করে ১৫ জনের কাজ একজন কৃষক একাই করতে পারেন। শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর অর্থ এটিই। ফসল উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে যন্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একাধারে এসডিজি অর্জন, উৎপাদন খরচের লাগাম টানা এবং কৃষিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমতার আওতায় এনে উন্নয়নের স্রোতধারায় যুক্ত করার মাধ্যমে এসডিজি অর্জন করতে গেলে কৃষিজ উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি ক্ষুদ্র-পরিসর খাদ্য উৎপাদকদের আয়ও দ্বিগুণ করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্যের জোগান, পর্যাপ্ততা ও নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব। তবে জোগান বাড়লে একই সঙ্গে পণ্যের দাম কমে যায়। কৃষিপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের ব্যর্থতার গল্প বেশ পুরনো। এ কারণে কৃষি খাতের বিপুল অর্জন প্রায়ই ম্লান হয়ে পড়ে। কৃষকের বাড়তি উৎপাদন শ্রম বৃথা যায়। দাম না পাওয়ায় হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে কৃষকের জীবনযাপন ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে।

ক্ষুদ্র-পরিসর খাদ্য উৎপাদকদের আয় দ্বিগুণ করতে ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তার বিকল্প নেই। উৎপাদনের পরিমাণ বাম্পার হোক অথবা দুর্যোগ পর্যুদস্ত, আয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সব পরিস্থিতিতে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির গ্যারান্টি প্রয়োজন। অথচ দেশে খোলাবাজারে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করার মতো কোনো একক কর্তৃপক্ষ নেই। ক্রেতা-বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছামতো দামে কেনাবেচা করলেও প্রচলিত আইনে তার কোনো শাস্তির বিধান নেই। আমদানিনির্ভর নিত্যদ্রব্যের দামের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকির আগাম আভাস বিবেচনা বা বাফার স্টক না থাকায়, কেবল এক মৌসুমে ফসলহানির জের বইতে হয় দীর্ঘদিন। অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত আমদানির কারণে গুদাম বোঝাই মজুদ বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

গত বছরের বোরো মৌসুমে ধানের দাম নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কৃষক দাম পেলেও নগদ অর্থ পকেটে পুরেছেন অনেক মধ্যসত্ত্বভোগী। শুধু আগাম প্রস্তুতিহীনতা ও নীতি পরিবর্তনে সময়ানুবর্তিতার অভাবে, সরকারের শতভাগ সদিচ্ছা ও চাল আমদানিতে ৫৫ শতাংশ কর আরোপের পরও ধানের ন্যূনতম মূল্য নিশ্চিত করা বা চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো সম্ভব হয়নি।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতের জন্য এসডিজি টার্গেটগুলো পূরণ করা খুব কঠিন নয়। তবে এজন্য প্রয়োজন সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শুধু ফলন বা উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিলে এসডিজির লক্ষ্য অর্জন দীর্ঘায়িত হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের নির্ধারিত সূচকের আলোকে কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ ও সংশ্লিষ্টদের আয় সুরক্ষা নিশ্চিতের গুরুত্বটুকু অনুধাবন করতে হবে। উৎপাদনের পরিমাণ বাম্পার কিংবা দুর্যোগ পর্যুদস্ত হোক, আয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সব পরিস্থিতিতে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির গ্যারান্টি দিতে হবে। কৃষি খাতের অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দ্রুত বাস্তবায়নের স্বার্থে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এজন্য জাতীয় পর্যায়ে চাহিদা-উৎপাদন-পচনের পরিসংখ্যানের গরমিল দূর করতে হবে। দুর্যোগকালীন ঝুঁকি নিরূপণে আরো সক্ষম হতে হবে।

এসডিজি লক্ষ্য পূরণে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণে ইউনিয়নভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় বাজার সক্ষমতা ও নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। সর্বোপরি দেশে কৃষিপণ্যের জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে। এ কমিশন সরেজমিন মাঠ ও বাজার পর্যবেক্ষণ করবে। একই সঙ্গে এতে থাকবে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইন প্রয়োগের ক্ষমতা। তবেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

 

লেখক: গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট