ঢাকা, মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

Live

করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দায় ঘুরে দাঁড়াতে করণীয়

কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান

১৬:৩২, ২৮ এপ্রিল ২০২০ মঙ্গলবার

পৃথিবী আজ স্তব্ধ। মানুষ আজ একা। শহর থেকে গ্রাম, দেশ থেকে মহাদেশ শুধু একাকীত্বের হাহাকার। রাজপথ শূন্য। শূন্য বাস ট্রেন। কোথাও কেউ নেই। করোনা নামক এক প্রকৃতিক দুর্যোগে মানুষ আজ দিশেহারা। উন্নত, অনুন্নত সব দেশ-মহাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আজ ভেঙ্গে পড়েছে। আর্থসামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা সুস্পষ্ট। ইতিহাসের দুর্ভিক্ষ, মহামারি, হিংস্রতা-যুদ্ধ আবার আলোচনা-পর্যালোচনায় সর্বত্র।

পৃথিবীতে যখনই কোনো দুর্যোগ কিংবা মহামারির আঘাত আসে তখন তার প্রভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি অর্থনীতি ও সামাজিক পর্যায়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ ধরনের বিপর্যয়ে অর্থনীতিতে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়। সেগুলো হলো- `ইকোনোমিক ডিপ্রেশন` ও `রিসেশন`। ইকোনমিক ডিপ্রেশন ও রিসেশন দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি `V` আকৃতির অন্যটি `U` আকৃতির। `V` আকৃতির অর্থনৈতিক মন্দা একটু সময় নিয়ে আসে। তাই পূর্ব থেকেই এর লক্ষণ বোঝা যায়। আর `U` আকৃতির মন্দা মহামন্দায় রূপান্তরিত হয়। যার কোনো লক্ষণ পূর্ব থেকে সুস্পষ্ট হয় না। তাই যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়ার পূবেই মানুষকে কর্মহীন করে। ফলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে যায়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অর্থনীতিতে এ ধরনের মন্দা ও মহামন্দা আমাদের পৃথিবীতে এর আগেও এসেছে। যেমন ১৯৩০ সালের গ্রেট ডিপ্রেশন। পরবর্তী সময়ে এই মহামন্দার কারণে মহাবেকারত্ব, মহামারি, অবশেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরে প্রায় ৭ দশক ধরে বিশ্বের অর্থনীতি সর্বনিম্ন অবস্থা থেকে একটানা উন্নতির দিকে যায়। এই দীর্ঘ সময় অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক মন্দা এসেছে এবং পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যেমন- সেভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। সেখানে মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে, মানবিক বিপর্যয় হয়েছে। যেখানে সোভিয়েত ইউনিয় থাকা অবস্থায় এক রুবল দিয়ে তারা ১০ কেজি চাল কিনতে পারতো। ১৯৯০ সালের দিকে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় তখন সেখানে বেকারত্ব সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং মুদ্রাটা একটা কাগজের বস্তুতে পরিণত হয়। তাদের মুদ্রার ক্রয় ক্ষমতা কমে যায় হাজার গুণ।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনেকবার অর্থনৈতিক মন্দা হয়েছে। জার্মানি, ইতালি, গ্রীসসহ নানা দেশে মন্দা হয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাতেও অনেকবার মন্দা-মহামন্দা হয়েছে।

ইকোনোমিক ডিপ্রেশন ও রিসেশনের ফলে অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়ে সেটি হলো বেকার সমস্যা। ১৯৩০ সালের মাহামন্দার সময়ও দেখা গেছে, সে সময় বেকার সমস্যা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এতে মানুষ ক্রয় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাহিদা যোগান কমে যায়। মানুষের আয় কমলে তার দৈনন্দিন ভোগ চাহিদা কমে যায়, তার সঞ্চয়ও কমে যায়। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমে যায়। এ ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় মোকাবেলা করার সকল ইনস্ট্রুমেন্ট সরকারের হাতেই থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এবং পৃথিবীতে যে সব দেশে অর্থনৈতিক ডিপ্রেশন হয়েছে তাদের সরকার কিন্তু তাদের `মনিটরি পলিসি` এবং `ফিস্কেল পলিসি`- এ দুটোর সংশোধন এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এ অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়েছে।

ফিস্কেল পলিসির মধ্যে রয়েছে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধিকরণ ও ট্যাক্সেশন পুনর্বিন্যাস। এক্ষেত্রে সরকারকে একদিকে যেমন তার ব্যয় বাড়াতে হবে অন্যদিকে ট্যাক্সেশনের জায়গাটিকে পুর্নবিন্যাস করতে হবে। আর মনিটরি পলিসিতে মুদ্রানীতি পরিবর্তন করে সুদের হার কমাতে হয় এবং অর্থ সরবরাহ এমনভাবে বাড়াতে হয় যাতে মুদ্রার ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস না পায়।

চলমান সংকট নিরসনে আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কতগুলো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থনীতি ঘিরে যে পরিমাণ বাজেট দেয়া হয়েছে সেটা যথেষ্ট হয়েছে কি হয় নাই- সেটা মূল্যায়নের বিষয় আছে। তবে আমরা বলবো যে, উদ্যোগটা অত্যন্ত সময়োপযোগী হয়েছে। কৃষিকে ঘিরেই আমাদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আমাদের যদি খাদ্য আমদানি করতে হয় তাহলে টাকা থাকলেও অন্য দেশ থেকে আপনি খাবার আনতে পারবেন না। আমাদের দেশে এখনও প্রায় ২ কোটি মানুষ একদিনের আয় দিয়ে একদিনের খাবার যুগিয়ে থাকে। তাদেরকে যদি ২-৩ মাস কোনো কাজ দেয়া না হয়, তাহলে যে যে ধরনের পেশাতেই থাকুক না কেন, সে তো কর্মহীন হয়ে যাবে বা গেছে। তাদেরকেও খাবার দিয়ে রাখতে হলে আগে আমাদের দেশে খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে দেশের এ সকল মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভর্তুকি দিয়েছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের দেশে কৃষির পরিবর্তন এসেছে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই। কৃষি ব্যবস্থাপনায় প্রোডাকশন টেকনোলোজি যথাযথভাবে প্রয়োগ করাই হলো কৃষি। কৃষি শুরু হয় একটি উন্নতমানের বীজ দিয়ে; আর এই বীজ উৎপাদন করে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএডিসি। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে বীজ উৎপাদন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এ বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায় এবং তাদের সঙ্গে সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করে আগামী ফসলটা উৎপাদনের জন্য কীভাবে উন্নতমানের বীজ কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া যায় সে দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই দুর্যোগ দীর্ঘ হতে পারে। কিন্তু এটাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বাভাবিকের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব। করোনাভাইরাস এখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভাইরাস মানবদেহে বংশবিস্তার করে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সুস্থ্য মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। কঠোর আদেশ জারি করা ছাড়া এই রোগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় লকডাউন বা সেমি-লকডাউন করে অর্থনৈতিক ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি না করে আপনি এই ভাইরাসের একটি জীবনচক্র অর্থাৎ ১৪ দিনের কারফিউ দিয়ে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও সুস্থ্য ব্যক্তিদের আলাদা করুন। যাতে সুস্থ্য মানুষগুলো কর্মমুখী হতে পারে এবং রোগাক্রান্ত মানুষগুলোকে যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আনা যায়। প্রণোদনার একটি অংশের টাকা থেকে ১৫ দিনের খাদ্যসামগ্রী যৌথবাহিনী, ত্রাণ কমিটি বা প্রশাসনের মাধ্যমে গরীব মানুষদের বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। তাহলে অনেক মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক মন্দার হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা কেটে যাওয়ার পরেই অনেকগুলো সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেই সুযোগগুলো কাজে লাগানোর জন্য আপনার মন্ত্রিপরিষদ এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে যারা বিষয়গুলো বোঝেন তাদেরকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে কী কী সুযোগ আসতে পারে তা আপনাকে আগে থেকেই নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে। যেমন- সুযোগ তৈরি হবে বায়োটেকনোলোজি ও আইসিটি সেক্টরে। ফার্মাসিটিকেল এবং কৃষিতে বায়োটেকনোলজির অনেক ব্যবহার রয়েছে। এ কারণে বায়োটেকনোলজির দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। বায়োটেকনোলোজির মধ্যে কৃষি এবং ফার্মাসিটিকেল ইন্ড্রাস্ট্রিগুলোর সম্ভাবনা অনেক বেশি তৈরি হবে। এ সেক্টরকে আমরা কীভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পারি সে জন্য ফার্মাসিটিকেল কোম্পানিগুলোর অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে বসা দরকার। সারাবিশ্বের ৪০ শতাংশ কনজামশন হয় আমেরিকাতে। শুধুমাত্র ওষুধ না, সমস্ত পণ্যেরই কনজামশন তাদের বেশি। সেখানে একটা বিরাট বাজার দখল করে আছে ভারতীয় আইটি গ্র্যাজুয়েটরা এবং তাদের কয়েক লাখ ইতোমধ্যে কর্মচ্যুত হয়েছেন। এ বাজারটা ফাঁকা হয়ে যাবে। আমাদের দেশের আইটি গ্র্যাজুয়েটদের জন্য একটি বিরাট সুযোগ তৈরি হবে। আমরা কীভাবে এ সুযোগটা নিতে পারি, সে ব্যাপারে আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন।

এছাড়াও করোনা বিশ্বজুড়ে মানুষের ব্যবহার, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। সে ক্ষেত্রে বর্হিবিশ্বে আমাদের দেশে উৎপাদন করা পণ্যগুলো থেকে নতুন ধরনের পণ্যের চাহিদা তৈরি হবে। সে পরিবর্তনকে ঘিরে আমাদের প্রস্তুতি কী হওয়া উচিত সে বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি।

 

লেখক: অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বিশ্লেষক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ওয়ান ফার্মা লিমিটেড