ঢাকা, মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

Live

করোনা-উত্তর খাদ্য সংকট মোকাবেলা এবং করণীয়

সমীরণ বিশ্বাস

১৫:৫৮, ১০ এপ্রিল ২০২০ শুক্রবার

নভেল করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯-এর ভয়াল থাবায় আজ কোণঠাসা গোটা বিশ্ব। বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে লাশের মিছিল। এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৩ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে। মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজারের। থমকে গেছে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা। বাংলাদেশও বাদ যায় নি প্রাণঘাতি এই মহামারির আঘাত থেকে। করোনার প্রকোপ থেকে বাঁচতে গৃহবন্দি কর্মক্ষম মানুষ, যার প্রভাব পড়েছে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। আশংকা করা হচ্ছে, করোনা-উত্তর পৃথিবীতে খাদ্য সংকট তৈরি হবে। দেশের এই ক্রান্তিকালে করোনা-পরবর্তী সময়ে এদেশকে খাদ্য সংকটের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে কৃষিখাতকে বাঁচাতে হবে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, কৃষক বাঁচলে তবেই বাঁচবে দেশ, মিটবে মানুষের খাদ্যের অভাব। সেই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের এখনোই সময় প্রস্তুতি নেয়ার।

কিন্তু শুধু শিল্প-নির্ভর অর্থনীতির ওপর ভিত্তি ক’রেই দেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির চাকাকে সচল রাখা সম্ভব নয়। কৃষিখাতকেও গুরুত্ব দিতে হবে সমান হারে। কৃষিখাতের যন্ত্রপাতি কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী করতে হবে। কৃষককে দিতে হবে বিনা মূল্যে সার, বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ। নয়তো পেঁয়াজের মতো হাহাকারে কাঁদবে দেশের মানুষ মৌলিক খাদ্যের জন্য। রাষ্ট্রকে শুধু শিল্পখাতের কারখানা নির্মাণে কৃষিজমি, আবাদি ভূমি বিনষ্ট ক’রে পরিবেশ ধ্বংস সাধন ক’রে অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে দূরদৃষ্টিস্মপন্ন হতে হবে। নয়তো প্রতিনিয়ত হ্রাস পাবে আমাদের দেশের কৃষিজমি। এর ফলে ভঙুর অবস্থায় পতিত হবে কৃষিখাত। কর্মহীন হয়ে পড়বে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কৃষকরা। রাষ্ট্রে দেখা দেবে ভয়াবহ খাদ্য সংকট।

দেশে বোরো ধান চাষের সার্বিক অবস্থা ভালো। সমস্ত বাংলাদেশের বোরো ধান কাটা ২০ দিন পর শুরু হয়ে যাবে! সেক্ষেত্রে এই বিশ্ব করোনা পরিস্থিতিতে আইসোলেশন দূরত্ব বজায় রেখে ধান কাটা একটি চরম চ্যালেঞ্জে পড়বে দেশ! দেখা দেবে চরম শ্রমিক সংকট! শুরু হবে খাদ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের চরম বিপর্যয়! বোরো ধানের একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয় হাওর অঞ্চলে। প্রতি বছরই হাওর অঞ্চলে ধান কাটার শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। করোনা দুর্যোগে এই সংকট আরো ভয়াবহ রূপ নেবে হয়ত। প্রতি বছর এ সময় হাওরে বোরো ধান কাটতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার-হাজার ধান কাটার কৃষি শ্রমিক আসে। কিন্তু করোনা সংক্রমণ আতঙ্ক এবং যানবাহন বন্ধ থাকায় কোনো শ্রমিক পাওয়া যাবে না। আগাম বন্যায় যাতে হাওর অঞ্চলের পাকা ধান শ্রমিক সংকটে তলিয়ে না যায়, তার প্রস্তুতি নেয়ার এখনোই সময়।

বোরোর আবাদে এখন মাঠে থোর এবং হেডিং, ফ্লাওয়ারিং অবস্থা চলছে। তবে এ সময় সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জরুরি ভিত্তিতে ৬৬ টাকার ১ লিটার ডিজেলের দাম কৃষককে অর্ধেক মূল্যে সরবরাহ এখনোই নিশ্চিত করতে হবে। ধান কাটা এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় এখনোই কৃষি মন্ত্রণালয়কে, ডিএই এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (যান্ত্রিকীকরণ) প্রস্তুতি নিতে হবে। সার্বিক মাঠ সুপারভিশনের জন্য উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদেরকে প্রয়োজনে মাস্ক, স্যানিটাইজার, পিপিই দেয়া যেতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য কৃষি উপকরণগুলো কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এছাড়াও কৃষির সাথে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাঠে থাকতে হবে। রাষ্ট্রের অভিভাবক এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নানামুখী অর্থনৈতিক ভর্তুকি এবং প্রণোদনা দিয়ে বাঁচাতে হবে আমাদের দেশের কৃষি শিল্পকে, আর বাঁচিয়ে রাখতে হবে এদেশের উজ্জ্বল সন্তান কৃষকদেরকে। নয়তো খাদ্যের তীব্র সংকটে নাজেহাল হবে দেশ।

সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি-সমন্বয়কারী, সিসিডিবি, ঢাকা। ফোন: ০১৭৪১১২২৭৫৫।

কৃষি কাগজ/এস এম