ঢাকা, বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০ | ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭

Live

এক বছরের বেশি সময়ের সর্বনিম্নে খাবারের দাম

১৬:৫৯, ১০ মে ২০২০ রোববার

চলতি বছরের এপ্রিলে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) খাদ্যপণ্যের গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১৬৫ দশমিক ৫ পয়েন্টে। মার্চের তুলনায় যা ৫ দশমিক ৭ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কম। একই সঙ্গে তা ২০১৯ সালের জানুয়ারির পর থেকে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে। এ নিয়ে টানা তিন মাস এফএওর ফুড প্রাইস ইনডেক্সে নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে। খবর এফএও।

নভেল করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারীতে রূপান্তরিত হওয়ার পর থেকেই এফএওর খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচকে টানা মন্দা ভাব বজায় রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম ক্রমেই কমছে। এপ্রিলে প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের মূল্যে ব্যাপক পতন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চিনির দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তবে খাদ্যশস্যের দাম তুলনামূলক কম হারে কমেছে।

এফএওর ফুড প্রাইস ইনডেক্স অনুযায়ী, এপ্রিলে খাদ্যশস্যের গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১৬৪ পয়েন্টে, আগের মাসের তুলনায় যা ৫ পয়েন্ট কম। আগের মাসের তুলনায় কমলেও পণ্যটির দাম ২০১৯ সালের একই মাসের তুলনায় এখনো বাড়তির দিকে রয়েছে। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছে ৪ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্ববাজারে গম ও চালের মূল্যে চাঙ্গা ভাব বজায় থাকায় এ সময় খাদ্যশস্যের বাজার বড় ধরনের পতনের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে।

এপ্রিলে গমের গড় মূল্য আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের জেরে দেশে দেশে খাদ্য নিরাপত্তার আশঙ্কা জোরালো আকার ধারণ করে। বিশ্বের শীর্ষ গম রফতানিকারক দেশ রাশিয়া অভ্যন্তরীণ বাজার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পণ্যটি রফতানিতে নির্দিষ্ট কোটা বেঁধে দেয়। তবে পণ্যটির চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী থাকায় ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশটি গমের যে রফতানি কোটা বেঁধে দিয়েছিল, এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই তা শেষ হয়ে যায়। ফলে মাসের কয়েকদিন হাতে থাকতেই খাদ্যপণ্যটির রফতানি পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করে দেশটি। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যায়।

একই চিত্র বজায় ছিল চালের বাজারেও। এ নিয়ে টানা চার মাস ধরে পণ্যটির দাম চাঙ্গা রয়েছে। আপত্কালীন অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগে থেকেই ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি শীর্ষ রফতানিকারক দেশ সাময়িকভাবে পণ্যটির রফতানি বন্ধের পরিকল্পনা করেছে। এর জের ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্চে পণ্যটির দাম বেড়ে ২০১৮ সালের জুনের পর থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে গিয়েছিল। এপ্রিলেও পণ্যটির দামে চাঙ্গা ভাব বজায় ছিল।

অন্যদিকে ব্যাপক মন্দায় পড়েছে ভুট্টার বাজার। টানা তিন মাস ধরে শস্যটির বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় এপ্রিলে পণ্যটির মূল্য আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে এরই মধ্যে চলতি মৌসুমের নতুন ফসল উঠতে শুরু করেছে এবং রফতানিযোগ্য ভুট্টার মজুদ বেড়ে গেছে। মহামারীর কারণে বিশ্বজুড়ে পশুখাদ্যের চাহিদা কমেছে। এছাড়া ইথানল জ্বালানির চাহিদা কমছে, যা পণ্যটির দামে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

এদিকে এপ্রিলে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে ভোজ্যতেলের বাজারে। গত মাসে পণ্যটির বৈশ্বিক মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১৩১ দশমিক ৮ পয়েন্ট, আগের মাসের তুলনায় যা ৭ দশমিক ২ পয়েন্ট বা ৫ দশমিক ২ শতাংশ কম। গত মার্চে পণ্যটির দাম কমে ২০১৯ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গিয়েছিল। টানা তিন মাস ধরে ভোজ্যতেলের দাম কমার পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে পাম অয়েলের মন্দা বাজার। নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর জেরে পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেছে। একই কারণে দাম কমেছে সয়াবিন ও সরিষা তেলের। তবে এ সময়ে সূর্যমুখী তেলের দাম বেড়েছে।

একই পরিস্থিতি বিদ্যমান দুগ্ধপণ্যের বাজারেও। এপ্রিলে পণ্যটির বৈশ্বিক মূল্যসূচক কমে ১৯৬ দশমিক ২ পয়েন্টে নেমেছে, আগের মাসের তুলনায় যা ৭ দশমিক ৩ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ কম। পণ্যটির দাম এ নিয়ে দুই মাস নিম্নমুখী রয়েছে এবং এপ্রিলে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রেকর্ড পতন ঘটেছে। ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় গত মাসে পণ্যটির দাম কমেছে ১৮ দশমিক ৮ পয়েন্ট বা ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ সময়ে স্বাভাবিকভাবে দুগ্ধপণ্যের দাম কিছুটা কমতির দিকে থাকে। এর ওপর নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বৈশ্বিক আমদানি চাহিদা কমে পণ্যটির দাম আরো কমে গেছে।

অন্যদিকে এপ্রিলসহ টানা চার মাস নিম্নমুখী রয়েছে আমিষ পণ্যের বাজার। এপ্রিলে আমিষজাতীয় পণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১৬৮ দশমিক ৮ পয়েন্টে, মার্চের তুলনায় যা ৪ দশমিক ৭ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৭ শতাংশ কম। নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর বিশ্ববাণিজ্যে স্থবির হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে লকডাউনের কারণে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে চীনসহ পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা ব্যাপক হারে কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে।

এদিকে এপ্রিলে বড় দরপতনের মুখে পড়েছে বৈশ্বিক চিনির বাজার। এ সময় পণ্যটির বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১৪৪ পয়েন্টে, আগের মাসের তুলনায় যা ২৪ দশমিক ৭ পয়েন্ট বা ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ কম। এমনিতেই মিষ্টি পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদায় দীর্ঘদিন ধরে মন্দা চলছে, এর ওপর মহামারীর প্রকোপে তা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সময় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পণ্যের চাহিদা রেকর্ড কমে যাওয়ায় আখ থেকে ইথানলের উৎপাদন কমেছে। এর পরিবর্তে বেড়েছে চিনি উৎপাদন। ফলে বাজারে পণ্যটির উদ্বৃত্ত সরবরাহ ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে, যা দাম কমানোর ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রেখেছে।